বাজারে পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় শেষ মুহূর্তে দামে পড়ে যায়। ফলে অনেকে লোকসান করে কম দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার অনেক পশু অবিক্রীত থাকায় বিপাকে পড়েছেন ব্যাপারীরা। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এবার কোরবানির সংখ্যাও কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যে কারণে পশুর চাহিদা কম থাকায় লোকসান গুনতে হয়েছে খামারি, কৃষক ও ব্যাপারীদের।
রাজধানী ঢাকার একটি গণমাধ্যমে কর্মরত মাহাবুর আলম সোহাগ। কোরবানি উপলক্ষে তিন বন্ধু মিলে নীলফামারী থেকে নয়টি গরু কিনে ঢাকায় এনেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসার পাশাপাশি নিজেদের একটি পরিচিতি তৈরি করা, যাতে আগামী ঈদ থেকে প্রি-বুকিংয়ের মাধ্যমে কোরবানির গরু সরবরাহ করতে পারেন। তবে সে পরিকল্পনায় ভাটা পড়েছে। উল্টো লোকসান গুনতে হওয়ার পাশাপাশি অবিক্রীত তিনটি গরু নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। তবে সে পরিকল্পনার বদলে লোকসানই সঙ্গী হয়েছে। বিক্রি না হওয়া তিনটি গরু নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন তিনি।
সোহাগ জানান, নীলফামারী থেকে গরুগুলো ঢাকায় আনতে তাদের ৩৫ হাজার টাকা ট্রাকভাড়া গুনতে হয়েছে। তবে নয়টি গরুর মধ্যে বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র পাঁচটি। বাকি চারটি অবিক্রীত থেকে যায়। এর মধ্যে পরিচিত একজনের অনুরোধে একটি গরু ক্রয়মূল্যেই বিক্রি করে দিয়েছেন। অবশিষ্ট তিনটি গরু এলাকায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। অবিক্রীত প্রতিটি গরুর ক্রয়মূল্য ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি। সেগুলো বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় একজনের কাছে পরিচর্যার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
মাহাবুর আলম সোহাগ বলেন, ‘গরু কেনার পর দেখাশোনা, খাবার ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতিটি গরুর পেছনে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। ক্রেতা না পেয়ে ৯১ হাজার টাকায় কেনা একটি গরু ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত খরচ তো আছেই, ক্রয়মূল্য থেকেও কম দামে বিক্রি করেছি। অবিক্রীত তিনটি গরু এলাকায় ফেরত পাঠাতে আরো ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কেনা একটি গরুর পেছনে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে আমাদের বিনিয়োগ প্রায় দেড় লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গরুগুলো বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একজনকে পরিচর্যার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখন লাভের চিন্তা নয়, লোকসান কতটা কমানো যায় সেটিই লক্ষ্য।’
শুধু মাহাবুর আলম সোহাগই নন, এবার ঢাকার হাটে গরু নিয়ে আসা অনেক খামারি, ব্যাপারী ও কৃষক একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের অধিকাংশের দাবি, পশু বিক্রি করে লোকসান গুনতে হয়েছে। আবার অনেককে অবিক্রীত কোরবানির পশু ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছে।
ঝিনাইদহ থেকে রাজধানীর গাবতলী হাটে চারটি গরু নিয়ে এসেছিলেন কৃষক আজগর আলী। এলাকার ব্যাপারীরা যে দাম প্রস্তাব করেছিলেন, তার তুলনায় ৩১ হাজার টাকা কমে তিনটি গরু বিক্রি করেছেন তিনি। এছাড়া ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দাম চাওয়া একটি গরু অবিক্রীত থাকায় ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গরুগুলো বাড়িতেই পালন করেছি। তিনটি গরুর জন্য এলাকায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দাম পাওয়া যেত। কিন্তু ঢাকায় সেগুলো ২ লাখ ৮৯ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। এতে ৩১ হাজার টাকা কম পেয়েছি। এর সঙ্গে ট্রাকভাড়া, বাবা-ছেলের চারদিনের থাকা-খাওয়ার খরচ এবং একটি গরু ফেরত নেয়ার ব্যয় যোগ করলে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক চাপে অনেকেই এবার কোরবানি দেননি। বিপরীতে বাজারে কোরবানির পশুর জোগান ছিল বেশি। ফলে ক্রেতার চেয়ে অধিক পশুর সরবরাহ থাকায় দামে ধস নামে। এতে যারা পশু বিক্রি করতে পেরেছেন তাদের মধ্যেও অনেকেই লোকসান গুনেছেন।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কৃষক আনিসুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কোরবানি দিলেও গত দুই ঈদে আর কোরবানি দিতে পারেননি তিনি। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। আগে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় পরিবারের এক সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত। এখন ওই টাকায় চার-পাঁচদিনও চলে না। কোরবানির খরচও অনেক বেড়েছে। ভাগে গরু কোরবানি করতেও ২৫ হাজার টাকার বেশি লাগে। সব মিলিয়ে গত দুই বছর কোরবানি দিতে পারিনি।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। তবে এ বছর ঠিক কতটি পশু কোরবানি হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পশু পালনের ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেকে এবার কোরবানি দেননি। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। তাদের ধারণা, গতবারের তুলনায় এবং সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এবার কম পশু কোরবানি হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, কম দামে গরু বিক্রি করেছেন—এমন অনেক বিক্রেতাই গতবারের গড় দামের চেয়ে বেশি দাম পেয়েছেন। তবে কোরবানির পশু পালনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। অন্যদিকে যারা কোরবানি করেছেন, তাদের প্রতি কেজি মাংসের জন্য গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পশুর উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। খাদ্য ও ওষুধের দাম বেশি। খামারি, চাষী ও ব্যাপারীরা লোকসান গুনলেও গতবারের তুলনায় গরুর দাম ১০ শতাংশের মতো বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং গরুর দাম অত্যধিক হওয়ায় অনেকেই কোরবানি করতে পারেননি। ফলে আমার ধারণা সরকার ১ কোটি পশু কোরবানির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার তুলনায় অন্তত ১০ লাখ কম কোরবানি হয়েছে। গতবার ৯১ লাখের কিছু বেশি কোরবানি হয়েছিল। এবার এর চেয়েও কম হবে বলেই মনে হচ্ছে।’
লোকসান ও কম দামে বিক্রির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘অনেক বিক্রেতা, বিশেষ করে বড় খামারিরা শুরুতে বেশি দাম চেয়েছেন। ১ লাখ টাকার গরুর জন্যও দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকিয়েছেন কেউ কেউ। এ কারণে শুরুর দিকে বিক্রি কম হয়েছে। পরে বাজারে অবিক্রীত গরুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেকে কম দামে বিক্রি করতে চেয়েছেন। কিন্তু তখন ক্রেতার সংখ্যা কম থাকায় অনেককে আরো কম দামে, এমনকি লোকসান গুনে গরু বিক্রি করতে হয়েছে। এ কারণেই ঈদের আগের দিন গরুর দাম পড়ে যায়।’